কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক: সিলেটে ঐতিহাসিক বাসিয়া নদী খনন কাজের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
- পোষ্ট টাইম : 2026-05-02 18:35:29
- 15482 বার পঠিত
সিলেটের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। আজ শনিবার দুপুরে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় ঐতিহাসিক বাসিয়া নদীর খাল পুনরায় খনন কাজের শুভ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই খনন কাজের সূচনার মধ্য দিয়ে অঞ্চলের প্রায় ৮০ হাজার কৃষকের দীর্ঘদিনের দুঃখ মোচনের পথ প্রশস্ত হলো।
আজ দুপুর ১২টায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী খনন কাজের ফলক উন্মোচন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রী, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
ফলক উন্মোচন শেষে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সিলেট আমাদের শস্যভাণ্ডার। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বাসিয়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাব—এই দুই সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন স্থানীয় কৃষকরা। আমাদের সরকার সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। বাসিয়া নদী খননের মাধ্যমে আমরা কেবল একটি জলাশয় উদ্ধার করছি না, বরং এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করছি।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দশকে পলি জমে এবং অবৈধ দখলের কারণে বাসিয়া নদীর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল। ফলে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছিল। এবারের মেগা প্রকল্পের অধীনে নদীর তলদেশ গভীর করার পাশাপাশি নদীর দুই পাড় সংস্কার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।
এই প্রকল্পের প্রধান সুফলগুলো হলো: ১. সেচ সুবিধা: শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়বে, ফলে বোরো চাষে কৃষকরা নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা পাবেন। ২. জলাবদ্ধতা নিরসন: বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হবে, যা দক্ষিণ সুরমা ও তৎসংলগ্ন এলাকার হাজার হাজার একর ফসলি জমিকে অকাল বন্যার হাত থেকে রক্ষা করবে। ৩. জীববৈচিত্র্য রক্ষা: নদীটি পুনরায় প্রাণ ফিরে পেলে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার বাড়বে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব মতে, এই নদী ও সংশ্লিষ্ট খালগুলো পুনখননের ফলে দক্ষিণ সুরমা এবং বিশ্বনাথ উপজেলার প্রায় ৮০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। আগে যেখানে পানির অভাবে শীতকালীন ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতো, সেখানে এখন সারা বছরই কৃষিকাজ সচল রাখা সম্ভব হবে।
স্থানীয় এক প্রবীণ কৃষক আব্দুল জলিল আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “বাসিয়া নদী একসময় আমাদের প্রাণ ছিল। গত দশ বছরে নদীটা মরে যাওয়ায় আমরা চাষবাস ছেড়ে দিচ্ছিলাম। আজ প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে কাজ শুরু করে দেওয়ায় আমরা আবার নতুন স্বপ্ন দেখছি।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো সিলেট জুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, বাসিয়া নদীর মতো দেশের অন্যান্য মৃতপ্রায় নদী ও খালগুলোকেও পর্যায়ক্রমে খনন করা হবে যাতে 'ব্লু ইকোনমি' বা নীল অর্থনীতির সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গুণগত মান বজায় রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খনন কাজ শেষ হলে নদীর দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
বাসিয়া নদীর এই পুনর্জন্ম কেবল কৃষি নয়, সিলেটের যোগাযোগ ও পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি হস্তক্ষেপকে সিলেটবাসী উন্নয়নের এক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে এবং বাসিয়া নদী ফিরে পাবে তার চিরচেনা রূপ।
